পটুয়াখালীতে যুব নেটওয়ার্ক – আভাস-এর উদ্যোগে কলাপাড়ায় কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য, বাল্য-বিবাহ এবং সামাজিক সচেতনতা বিষয়ে বৈঠক
কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকতে বিকেলের আলো নামছিল ধীরে ধীরে। ঢেউয়ের শব্দের ভেতরেও আলাদা করে চোখে পড়ছিল একদল তরুণ-তরুণী। কারও হাতে পোস্টার, কেউ কথা বলছেন পথচারীদের সঙ্গে, কেউবা ছোট ছোট দলে দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করছেন—যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ, কিংবা নিরাপদ সমাজের কথা। সৈকতের এই দৃশ্য যেন অন্যরকম এক বার্তা দিচ্ছিল—পরিবর্তন শুরু হতে পারে এখান থেকেই।
পটুয়াখালী জেলার পটুয়াখালী, কলাপাড়া ও কুয়াকাটা—এই তিন এলাকার ৪০ জন তরুণকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি এসআরএইচআর (যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার) নেটওয়ার্ক। তারা এসেছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। উদ্দেশ্য একটাই—নিজেদের কমিউনিটিতে সচেতনতা বাড়ানো এবং বাস্তব পরিবর্তন আনা।
সোমবার পৌর শহরের ‘আপন ভুবন’ হলরুমে দিনব্যাপী এক বৈঠকের মাধ্যমে এই উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ‘আভাস’-এর আয়োজনে ‘ইয়ুথ শেয়ার নেট’ প্রকল্পের আওতায় অনুষ্ঠিত এই সভায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। আলোচনায় উঠে আসে কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য, জেন্ডার সমতা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং যৌন নির্যাতন রোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।
বক্তারা তরুণদের সামনে শুধু সমস্যা তুলে ধরেননি, দেখিয়েছেন সম্ভাবনার পথও। ইয়ুথ শেয়ার নেট প্রকল্পের প্রজেক্ট অফিসার ময়ূরী আক্তার টুম্পা এবং আভাসের প্রজেক্ট ম্যানেজার মনিরুল ইসলাম তরুণদের নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তাঁরা বলেন, “যুবরাই পারে নিজেদের সমাজকে ভেতর থেকে বদলাতে—যদি তারা তথ্য জানে, বুঝে এবং একসঙ্গে কাজ করে।”
স্থানীয় সাংবাদিক ও সংগঠকরা এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। কলাপাড়া টেলিভিশন জার্নালিস্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. ফরিদ উদ্দিন বিপু এবং রিপোর্টার্স ইউনিটির অর্থ সম্পাদক ফরাজী মো. ইমরান তাঁদের বক্তব্যে বলেন, প্রান্তিক এলাকায় সচেতনতা তৈরিতে তরুণদের ভূমিকা অপরিহার্য। কারণ, তারাই সবচেয়ে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—যুব নেটওয়ার্ক গঠনের বাস্তব পরিকল্পনা। কীভাবে এই নেটওয়ার্ক কাজ করবে, কীভাবে তারা নিজেদের এলাকায় কার্যক্রম চালাবে—এসব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারী তরুণদের অনেকেই জানান, তারা নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাড়া-মহল্লা এবং সামাজিক পরিসরে ছোট ছোট সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করতে চান।
দিনের আলোচনা শেষ হয় কুয়াকাটা সৈকতে একটি সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে। পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে তরুণরা যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, নিরাপদ আচরণ এবং সম্মানজনক সম্পর্কের বার্তা পৌঁছে দেন। অনেকে আগ্রহ নিয়ে তাদের কথা শোনেন, প্রশ্ন করেন, কেউ কেউ আবার নিজের অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নেন।
এই উদ্যোগ শুধু একটি দিনের কর্মসূচি নয়—এটি একটি প্রক্রিয়ার শুরু। যেখানে তরুণরা নিজেদের জ্ঞান বাড়াবে, নেতৃত্ব তৈরি করবে এবং ধীরে ধীরে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখবে। প্রান্তিক এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতার ঘাটতি পূরণে এমন উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।
শেষ পর্যন্ত, কুয়াকাটার সেই বিকেল যেন একটাই কথা মনে করিয়ে দেয়—পরিবর্তন দূরের কিছু নয়। সঠিক তথ্য, সচেতনতা এবং তরুণদের সম্মিলিত উদ্যোগ থাকলে, ঢেউয়ের মতোই তা ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো সমাজে।